কোনো একটা চেয়ারে বসে আছি। দেখতে পাচ্ছি, চারিপাশে ঘাস। সবুজ ঘাস। বসে থাকা অবস্থাতেই সামনে থাকা ছোট্ট ফুটপাথটায় পা ছুঁই ছুই করছে আমার। সেদিক দিয়েই একটা মেয়ে যাচ্ছিলো। দেখে মনে হলো, ক্লাস সেভেন কি এইটের হবে। ইউনিফর্ম পরে আছে। সবুজ আর আকাশীর মাঝামাঝি একটা রং। পেস্ট কালার। রাস্তায় আমার পা থাকায় সে যেতে পারছেনা। সে বিনয়ের সুরে জায়গা চাইলো হেঁটে যাওয়ার জন্য। আমি কোনো ভ্রুক্ষেপ করলাম না। সে কে? আমি কেন তার জন্য পা সরাব? আচ্ছা, আমি এখানে বসে আছি কেন? এই জায়গাটা কোথায়?
একটু পর, অদূরে একটা স্কুল বিল্ডিং দেখতে পেলাম। অবস্থা দেখে স্কুলটাকে সরকারিই মনে হলো। দেখলাম, গ্রাউন্ড ফ্লোরের একটা রুমে মেয়েটা। নোটিশ দিচ্ছে। নোটিশ দেওয়া শেষে মেয়েটা আমার দিকেই এগিয়ে এলো। ক্ষমা চাইলো, আমাকে ডিস্টার্ব করায় তার নাকি অনুশোচনা বোধ হচ্ছে।
তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কীসের নোটিশ দিচ্ছো? আমার পরিচয় দেওয়া শুরু করতেই সে আমার কথা আঁটকিয়ে বললো, ভাইয়া, আপনাকে চিনি আমি। এখানকার সবাই চেনে। আমি অবাক হয়ে গেলাম। আমি এখানে কীভাবে এলাম, বা এটা কোন জায়গা, আমি কিছুই জানিনা। ওরা নাকি আমাকে চেনে।
মনে হলো, মেয়েটাকে একটু জিজ্ঞাসা করি। আমি কোথায়? এই জায়গাটার নাম কী? কোন জেলা এটা? প্রশ্ন করবার আগেই ট্রেনের হর্ণ শুনতে পেলাম। পেছন ঘুরে দেখি, স্কুলের মাঠটা যেখানে শেষ হয়েছে, ঠিক সেই বরাবর একটা রেললাইন চলে গেছে। লাইনের দুদিকে বিস্তীর্ণ মাঠ। সবুজ ঘাসে ভরা। বাতাস বইছে। ঘাসেরা আনন্দ করছে। এতোকিছু অবজার্ভ করতে করতে ট্রেন এসে গেলো। আশ্চর্য। একটা লোকোমোটিভ, তারসাথে শুধু একটাই কামড়া। দেখতে পেলাম, কোনো যাত্রী নেই। নেমপ্লেটে লেখা ‘তূর্ণা নিশীথা’।
মেয়েটার পরিচয় জানতে চাইলাম। সে তার নাম-পরিচয় ছোট করে বললো। আমি এক কান দিয়ে শুনে আরেক কান দিয়ে বের করে দিয়েছি। নাম-ধাম মনে রাখে কে? সে জানালো, সে নাকি মেডিসিন নিয়ে কাজ করছে। ক্লাস সেভেন কি এইটের একটা মেয়ে, মেডিসিন নিয়ে…! ভালো লাগলো শুনে। না জানতে চাইলেও মেয়েটা বললো, তার মা নাকি খুব নতুন একটা ডিজিজে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিলো। রোগের চিকিৎসা ছিলো অবশ্য, তবে ‘ইন্টেলেকচুয়াল রয়ালটি’ থাকার কারণে নাকি ওষুধের দাম ছিলো কয়েক কোটি টাকা। সে তার মাকে নিজের চোখের সামনে মারা যেতে দেখেছে। জসীম উদ্দীনের পল্লীজননী কবিতায় নিরুপায় মা তার রুগ্ন ছেলের মৃত্যুর প্রহর গুণেছে, আর মেয়েটা তার মায়ের। তারপর থেকেই নাকি সে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, সে মেডিসিন জিনিসটাকে সবার কাছে এক্সেসিবল করেই ছাড়বে। সি ওয়ান্টস টু ডেডিকেট হার লাইফ ফর ইট। তাদের চোখে জল চলে এলো। মেয়েটার সাথে তার ছোট ভাইও ছিলো। সে যতোক্ষণ এই কথাগুলো বলছিলো, ততোক্ষণে আরও কয়েকটা ট্রেন গিয়েছে সামনের সেই লাইন দিয়ে। সবগুলোর ক্ষেত্রেই এক ঘটনা, ট্রেনে কামড়া মাত্র একটা। আচ্ছা, এখানকার ট্রেনগুলো কি এমনই? মেয়েরা জিওগ্রাফিতে খারাপ জেনে আমি তার ছোট ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, আমরা কমলাপুর স্টেশন থেকে কতো কিলোমিটার দূরে আছি? উত্তর দিকে, না দক্ষিণে? সে উত্তর দিলে না। মেয়েটাও না। আমি রেল লাইনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। অজানায়।