বিকাল চারটা বেজে পঞ্চান্ন মিনিট। ফতেহ আলী ব্রিজে দাঁড়িয়ে আছি। রুপমের জন্য অপেক্ষা করছি, সে এলে একসাথে প্রাইভেটে যাব। ছেলেটা বরাবরের মতো আজকেও দেরি করছে আসতে। পাঁচটা থেকে পড়া শুরু। এমন সময় চোখ গেলো এক বৃদ্ধার দিকে। গায়ে জীর্ণ-শীর্ণ পোষাক। গা দেখে মনে হলো বহুদিন ধরে গোসল করেন না। চুলও জট বাঁধা। পর্যবেক্ষণ করছি, তিনি আমের খোসা ছাড়াচ্ছেন। খানিক পর তিনি খোসা দূরে ছুড়ে ফেলে দিয়ে আমের ওপর মনোনিবেশ করলেন। তার মুখভর্তি ‘খুশি’।

পথে প্রান্তরে ঘুরে বেড়ানো মানুষদের চোখেমুখে সাধারণত এমন আনন্দ দেখা যায় না। তাদের মুখে এমন হাসি দেখতে পাওয়া কোনো মহাজাগতিক ইভেন্টের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। আগে টিভিতে একটা বিজ্ঞাপন চলতো। ছোটবেলায় আম খাওয়ার স্মৃতি নিয়ে। এক বুড়ো আমের জুস খাচ্ছেন, তার শৈশবের স্মৃতি মনে পড়ে যাচ্ছে। তিনি আম কুড়াচ্ছেন, আম টিপে সেখান থেকে রস খাচ্ছেন - নস্টালজিয়া! আচ্ছা, বিজ্ঞাপনের প্রোডিউসার কি বিভূতিভূষষের ‘পড়ে পাওয়া’ পড়েছিলেন? গল্পটা কি কোনো প্রভাব ফেলেছিলো তার সে কর্মে?

যাহোক, প্রসঙ্গে ফিরি। আম শুধু একটা ফল না। আম একটা ব্লেসিং। বর্তমানের লোহা-লস্করের দুনিয়াতে মানসিক প্রশান্তি খুব কমই পাওয়া যায়। যতই হাসার চেষ্টা করেন না কেন, একটা সার্টেইন পয়েন্টে গিয়ে হতাশা আপনাকে ‘হ্যালো!’ বলবেই। আপনি আপনার ফুল পোটেনশিয়াল দিয়ে হাসিখুশি থাকতে পারবেন না। অথচ, কর্পোরেট নরকে পুড়তে থাকা কোট-টাই পরা এক পুরুষকে আপনি আম খেতে দেন, সে দুনিয়ার লোহা-লস্করের কথা ভুলে যাবে। তার আম খাওয়া পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। আম যদি খেতে ভালো হয়, তাহলে সেই কর্পোরেট সৈনিকের মাঝে এখনও যে কিনচিৎ পরিমাণ বাচ্চা বেঁচে আছে, তার দেখা পাবেন আপনি। মনে লোহা-লস্করের সেই জায়গা দখল করে নিবে আম, আমের রস, আমের মিষ্টতা। নিজের অজান্তেই তার মুখে একটা হাসি চলে আসবে। আর্টিফিসিয়াল অট্টহাসি নয়। একেবারে ছোটখাটো অথচ অথেন্টিক মুচকি হাসি।

আম খান। আম খেলে মানুষ খুশি থাকে। হতাশা ভুলে যায়। বাচ্চা হয়ে যায়।