“মহারাজের মতো বসে আছিস! রোদ পোহানো হচ্ছে, না?”
কুয়াশার সাথে যুদ্ধে জিতে গিয়ে সবেমাত্র সূয্যিমামা নিজের মিষ্টিমধুর দীপ্তির জানান দিয়েছে। কয়টাই বা বাজে? আটটা-নয়টা? সময়ের কথা ঠিক মনে না থাকলেও এইটুকু মনে আছে যে, আমি ক্লাসের জন্য দেরি করে ফেলেছি। শীতের সকাল। স্যারের কাছে আটটা থেকে ফিজিক্স পড়ার কথা আমার। ঘুম থেকে উঠেছি বন্ধু রুপমের ফোন পেয়ে, ঘড়িতে তখন আটটা বেজে এগারো মিনিট। ঠিক চার মিনিটে তৈরি হয়ে, আটটা পনেরোয় বাসা থেকে বের হলাম।
প্রত্যেকদিন আমি যে রাস্তাটা ধরে পড়তে যাই, আমি নিশ্চিত, বিভূতি বা জীবনানন্দ এ রাস্তার প্রেমে মাতোয়ারা হয়ে কম করে হলেও দুই লাইন লেখতেন। পাশ নিয়ে করতোয়া নদী বয়ে গেছে। রাস্তার দুপাশে সবুজের চেয়েও গাঢ় গাছ। রাস্তাটাও সুন্দর, আঁকাবাঁকা। পিচঢালা। তবে আজ দেরি হয়ে গেছে, আজ আমার জীবনানন্দ হলে চলবেনা। বড় বড় ধাপে হেঁটে চলেছি। ওইত্তো, দুরে হাতের বা পাশে একটা মুদিখানার দোকান। সত্তোরোর্ধ এক বৃদ্ধ, যিনি দোকানটা চালান, বাইরে একটা চেয়ার নিয়ে বসে আছেন। রোদের মিষ্টতা এখন আরেকটু বেড়েছে। দোকানটার পাশ দিয়ে যাবার সময় দেখতে পেলাম, বৃদ্ধ কারও সাথে খুব খুশিমনে গল্প করছেন। আদুরে গলায়। কার সাথে গল্প করছেন তিনি? কৌতুহল হলো আমার। হাঁটার গতি কমাতেই একটা লালচে কুকুর চোখে পড়লো। সেও বৃদ্ধের পাশে বসে গায়ে রোদ মাখছে। বৃদ্ধকে বলতে শুনলাম, “মহারাজের মতো বসে আছিস! রোদ পোহানো হচ্ছে, না?” কুকুরটা কিছু বললো না। বলবেই বা কী করে? সে তো নিছক এক অবলা প্রাণী। মনে মনে বৃদ্ধর কাণ্ড ভাবছি, এসময়ই বৃদ্ধ আবার বলে উঠলেন, “তা বৈ কী! আরাম কর!” আচ্ছা, কুকুরটা কি সত্যিই বৃদ্ধর সাথে কথা বলতে পারে? এমন কোনো ভাষায়, যা আমরা বুঝি না?
তখনই আমার মানসপটে পোষা বিড়ালটার কথা মনে পড়ে গেলো। তার সাথেও তো আমি দিনরাত কথা বলতাম! জবাবে সে মিউধ্বনি বাদে কিছু না দিতে পারলেও, আমার কাছে দুই বর্ণের সেই শব্দটার মানে ছিলো অনেক কিছুই। তর্জমা করলে হয়তো খুব ছোট এবং পানসে একটা নভেল লিখে ফেলতে পারতো এই অধম।
আমি ভাবছি। হাঁটছি। মন্থর গতিতে। আচ্ছা, দেবীপ্রসাদের লেখা “যে গল্পের শেষ নেই” বইটা পড়েছেন? বইটায় ইন্দ্রজালের কথা শৈল্পিকভাবে ফুটে তোলা হয়েছে। কোটি বছর আগে, যখন মানুষরা এতোটাও সভ্য হয়নি, যখন মেয়েরা সবেমাত্র কৃষিকাজ করতে শিখেছে, তখনকার কথা বলা হয়েছে বইয়ের একটা অংশে। কোনোবছর, যেবার খরা হয়েছিলো, বৃষ্টির পানি না পেয়ে তাদের ফসল হয়নি, সেবার তারা নিজের মানসপটে বৃষ্টি তৈরি করে নিয়েছিলো। ঝিরি থেকে পানি সংগ্রহ করেছিলো তারা। তারা দলবেঁধে সমবেত হয়ে তারপর সেই পানি আকাশে ছুঁড়ে দিয়েছিলো, সেই পানি ফোটায় ফোটায় পড়েছিলো আবার তাদেরই মুখে।
বৃষ্টি! বৃষ্টি!! আসলে নেই তো কী হয়েছে? আমাদের কল্পনায় তো আছে! দীর্ঘ খরার পর বোকা সে হোমো স্যপিয়েন্সদের আনন্দ দেখে কে! সেই যে হোমো স্যপিয়েন্সরা কল্পনার জগত বানানো শুরু করলো, সে জগত, যে জগতে মনের প্রতিফলন ঘটে, অসম্ভব সম্ভব হয়, সে জগতের নাম হয়ে গেলো ইন্দ্রজাল।
এতোক্ষণে মুদিখানার সেই দোকান থেকে বেশ দুরে চলে এসেছি আমি। পিছনে ফিরে দেখতে পেলাম, বৃদ্ধ এখনও তার কল্পনার জগতে কুকুরটার সঙ্গে গল্প করে যাচ্ছেন। ইন্দ্রজালের গল্প।