হয়তো ক্লাস নাইনের ঘটনা হবে। অথবা টেনের। স্কুলে দিবা শাখায় পড়ি, তাই সকালে সাতটা থেকে এগারোটা পর্যন্ত প্রাইভেট থাকে। তো, প্রাইভেট পড়ার পর, Brunch করতে হয়। সাড়ে এগারোটা নাগাদ আমরা স্কুলে হাজির হতাম। অনেকের মা নিজে খাবার আনতো। নানা জটিলতার কারণে আমার মা খুব কম দিনই নিজে স্কুলে খাবার এনেছেন, আমি সকাল বেলা টিফিন বক্সে করে খাবার নিয়ে যেতাম। খাবার তো আনা হলো, এবার খেতে হবে! প্রভাতী শাখার ছুটি হয় ১১:৫০ এ। আমাদের ক্লাস শুরু হয় বারোটার পরপরই। খাবার খাবো কই? এ সমস্যার সমাধান হিসাবে একটা cheat code ছিলো আমাদের। সিক্স থেকে টেনের ক্লাস দেরিতে ছুটি হলেও, আনুমানিক দশটার পরে থ্রী থেকে ফাইভের ছুটি হয়ে যেতো। আমাদের দামড়াদের ক্লাসে তখনও ক্লাস চলতেসে, ওইদিকে প্রাইমারির রুম ফাঁকা। আমরা ব্যাগ-বুগ নিয়ে ওদের রুমে রেফিউজির মতো যেতাম, খাবার খাওয়ার জন্য। দিবা শাখার জুনিয়ররা ব্যাগ রেখে কেউ মাঠে খেলতে বের হইতো, অনেকে রুমে বসে থেকে আমাদের দিকে হা করে চেয়ে থাকতো। হয়তো ভাবতো, ‘এই দামড়া ব্যাডারা ডেইলি আমাদের রুমে আসে কেনো?’ ওদের সময়ে থাকতে আমরাও আমাদের সিনিয়রদের এহেন দশা দেখে একই কথা ভাবতাম। এটা আমাদের স্কুলের পরম্পরা। তো, একদিন, ক্লাস ফোরের রুমে বসে খাইতেসি। ডিমভাজা, আলুছানা, বুটের ডাল। অন্যতম প্রিয় খাবার। পাশে বন্ধু ‘রুডিগার’ (ছদ্মনাম) ছিলো। সে অবশ্য খাবার খাচ্ছিলো না, পাশে বসে ছিলো। খাবার খেতে খেতে ওর সাথে জীবনমুখী নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছিলো। ছেলেটার সাথে বিজ্ঞান, হিউমার সব নিয়েই কথা বলা যায়। সরকারি স্কুল, তারমধ্যে দুই শিফটের অন্তর্বর্তীকালীন অবস্থা রুমটাতে। কোনো টিচার নাই। বাচ্চাকাচ্চারা এই ফাঁকে রুমের সামনে থাকা টিচারের টেবিলে টেবিল টেনিস খেলা শুরু করছে। টেপ টেনিস বল দিয়ে। খেলা চলতেসে, দেখতেসি, ভাত খাইতেসি, রুডিগারের সাথে উচ্চমার্গীয় আলোচনা করতেসি। ভোর সাড়ে ছয়টায় ঘুমহীন চোখে বাসা থেকে বের হওয়া আমার কাছে জিনিসটা ব্যাপক ডোপামিন বুস্ট হিসাবে কাজ করতেছিলো। ভাত অর্ধেক খাওয়া হইছে, টেবিল টেনিস খেলাটাও জমে উঠছে। অভিজ্ঞতা বলে, একটু পর আন্ডাবাচ্চাদের মাঝে ক্যাঁচাল লাগবে খেলা নিয়ে। ঠিক সেই চরম মুহুর্তে, রুমের গেটে দেখি, আমাদের হেডস্যার, মিস্টার ‘শ্যাম্পু’ এসে হাজির! ভাত খাইতেসি। তাও আবার illegally অন্য রুমে বসে। সেই অবস্থাতেই ডেস্ক থেকে উঠে দাঁড়াইলাম। হাজার হোক স্যার মানুষ, সম্মান দিতে হবে। রুডিগারও দাঁড়াইছে। চোখ গেলো জুনিয়রগুলার দিকে। ওরা টেবিল টেনিস খেলতেসিলো। টিচারের টেবিলে। হেডস্যারের সামনে! জনাব শ্যাম্পু একটা ধমক দিলেন। রুম শান্ত হয়ে গেলো। জুনিয়ররা যারা খেলা দেখতেছিলো, ওরা নিশ্বাস নিতে ভুলে গেছে পুরা। স্বাভাবিক। কিন্তু যেই ছেলেটার হাতে তখন বলটা ছিলো, সে সরল স্পন্দিত দোলকের মতো হোঁসফোঁস করতেছিলো। নিয়ার ডেথ এক্সপিরিয়েন্স বলে একটা বিষয় আছে। পিচ্চি জানতে পারছে সেইদিন। স্যার এখন ওদের বকা দেবেন। কী বলে বকা দিবেন, সেইটা মুখস্ত আমার। তবে সেইদিন খালি একের পর এক আনপ্রেডিক্টেবল ঘটনাই ঘটতেছিলো। স্যার আমার দিকে তাকায়ে বললেন, “এইটা খাবার জায়গা না”। আমি তখন খাবার সবেমাত্র অর্ধ-গলাধ:করণ করছি। হাত মাখা। দাঁড়ায়ে আছি। উত্তর দিলাম, “জ্বি স্যার।”

স্যার চলে গেলেন। জুনিয়ররা আর টেবিল টেনিস খেললো না। কলম দিয়ে একটা খেলা হয়, টোকা মেরে অপোনেন্টের কলম ফেলে দেওয়াই যেইটার মূল অবজেক্টিভ। বানরশাবকেরা সেই খেলা খেলা শুরু করলো। টিচারের টেবিলে।