দুই হাজার সতেরো সালের কথা। স্বপ্নের স্কুলে তখন নতুন নতুন ভর্তি হয়েছি, ক্লাস থ্রীতে। মার্চ মাসের শুরুর দিকের কোনো একটা তারিখ ছিলো সেদিন। আমাদের স্কুলে এসএসসির সেন্টার বসে, তাই ফেব্রুয়ারি মাসটা যথারীতি ছুটিই থাকে। জানুয়ারী মাস নানা ফর্মালিটি আর ফেস্টেই পার হয়ে গেছিলো। স্কুলটা আমার কাছে একেবারেই নতুন। ইয়াআআ বড় ক্লাসরুম, রঙ-বেরঙয়ের টিচার, চেনা-অচেনা সহপাঠী। দীর্ঘ ছুটির পর সেদিন ছিলো প্রথম ক্লাস। নতুন ভবনে নিয়ে গিয়ে বসানো হলো আমাদের। দুই শাখা একসাথে, ক্লাসে টিচারও প্রবেশ করলেন দুইজন। একসাথে। তাদের একজনকে আমি চিনি। ফারাজ (ছদ্মনাম) স্যার। তিনি আমার শাখার শ্রেণি শিক্ষক. জানুয়ারি মাসে যে দুই-এক দিন ক্লাস হয়েছে, তাকেই দেখেছি। আরেকজনকে আমি চিনিনা। আগন্তুক সেই শিক্ষক এসেই অজানা এক এক্সেন্টে বলা শুরু করলেন, “ডি শাখার স্টিউডেন্টস, এখন রোল কল হবে! বি অ্যাটেনটিভ!” তার কথা আমার শাখার সবার কাছে অপরিচিত ঠেকেছিলো বটে। তাই তো আমরা সবাই ‘সাবধান’ হয়ে বসে গিয়েছিলাম। রোল কল হচ্ছে ওদের। ক্লাসরুমের বামপাশে ওরা বসে। আমরা ডানে। ছোট্ট বিড়ালশাবক যেভাবে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে, সবকিছু অবজার্ভ করে, ঠিক সেভাবেই সবকিছু অবলোকন করছিলাম আমি। আমরা সবাই। ক্লাসরুম, লাইট, ফ্যান, টিচার, ক্লাসমেইট - সবকিছুই। রোলকল শেষ হলো ওদের। আমাদেরও।
তখন সেই আগন্তুক বললেন, “নাও স্টিউডেন্টস, রাইট আ প্যারাগ্রাফ ডেসক্রাইবিং হাউ ইয়্যু হ্যাভ স্পেন্ট ইয়োর ভ্যাকেইশান”। কথা শুনে আমরা অনেকগুলো বিড়ালশাবক স্যারের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। বুঝিনি কিছুই। তিনি বাংলায় তর্জমা করে দিলেন এবার।
লিখতে শুরু করলাম। এতোদিন তো শুধু ন্যাশনাল ফ্ল্যাগ আর এ কাউ এর প্যারাগ্রাফ লেখে এসেছি। ভ্যাকেশন নিয়েও প্যারাগ্রাফ হয়? নতুন ঠেকলো জিনিসটা।
“দ্য টাইমজ নাও ওভার!” বললেন আগন্তুক। তখনও আমরা বিড়ালশাবকেরা অবাধ্য হতে শিখিনি। সাথে সাথেই লেখা বন্ধ করে দিলাম। “ডি-জিরো-নাইন! রিড এলাউড হোয়াট ইয়্যু হ্যাভ রিটেন!” ডি শাখার নয় রোলের ছেলেটা দাঁড়ালো। বুঝলোনা কিছুই, স্যারের দিকে তাকিয়ে থাকলো। স্যার বাংলায় বলার পর ছেলেটা বুঝতে পারলো তার ওপর আনত দায়িত্ব। নিজের লেখা প্যারাগ্রাফটা পড়তে শুরু করলো সে। এরপর আরেকজন। তারপর অন্যজন। আগন্তুকের মুখে হাসি নেই। একের পর এক ভুল ধরে যাচ্ছেন তিনি।
“এনিয়ান উইলিং টু ভলান্টারিলি শেয়ার দেয়ার স্টোরি?” বললেন তিনি। প্রতিবর্ত ক্রিয়া কাজ করে বসলো আমার। হাত তুললাম। “গো অন”, বললেন সেই আগন্তুক।
আমার গল্পে কী-বা আছে? ছুটিতে নানুবাড়ি বেড়াতে যাওয়া? খেজুরের রস পান করা? ব্যাডমিন্টন খেলা? বাবার সাথে স্টেশনে গিয়ে র্যান্ডম গন্তব্যের কোনো একটা ট্রেনে উঠে পড়া? এইত্তো। বেশিকিছু তো নেই। সেটুকুই বললাম। স্যারের ফ্যাকাশে মুখে হাসির চিহ্ন দেখতে পেলাম। “হোয়াট ইজ ইয়োর নেইম?” “হিমেল, স্যার।” “হিমেল! নামটা আমার আজীবন মনে থাকবে। সুন্দর লিখেছো।” শৈশবের শেষপ্রান্তে থাকা সেই বিড়ালশাবকের জীবন ছিলো অতি সাধারণ। ব্যাপ্তিও তো ছিলো সামান্য। “আমার মতো ছোট্ট একজনের নাম কেউ মনে রাখবে? আজীবন? তাও আবার আমার স্কুলের একজন শিক্ষক? শুনেছি এই স্কুলের স্যাররা অনেক বড় মাপের মানুষ। এতো জ্ঞানী একজন মানুষের মনে জায়গা হবে আমার?” - ভাবলো সেই বিড়ালশাবক। “সিট ডাউন” শোনার পর বসে পড়লো। তার মুখভর্তি হাসি।
(আট বছরের স্কুল জীবন শেষ হয়েছে। স্যার আজও আমাকে মনে রেখেছেন। সেই বিড়ালশাবক আজ বাঘ হয়ে উঠতে না পারলেও, একটুখানি বেড়েছে হয়তো। তার এ বেড়ে ওঠার পেছনে সমগ্র স্কুল জীবনে সেই আগন্তুকের কাছ থেকে পাওয়া গাইডেন্স, শাসন, হোঁচট খেয়ে পড়ে যাবার সময় সাপোর্ট - এসবের কথা অনস্বীকার্য।)